রাজধানীতে বাড়ছে ছিনতাইয়ের নির্মমতা। আট মাসে সাতজনের মৃত্যু, গ্রেপ্তার ১৮৩৭ জন। জামিনের ফাঁকে আবারও অপরাধে জড়াচ্ছে ছিনতাইকারীরা। বিস্তারিত পড়ুন।
ব্যস্ত সড়ক। রিকশায় চড়ে গন্তব্যে যাচ্ছিলেন রনজিনা পারভীন (৫৫)। বগুড়ার বাগবাড়ী বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন তিনি। জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে মোটরসাইকেলে আসা ছিনতাইকারীদের আচমকা এক হ্যাঁচকা টান! ভ্যানিটি ব্যাগটি বাঁচাতে গিয়ে চলন্ত রিকশা থেকে ছিটকে পড়েন তিনি। তাকে বাঁচানো যায়নি। গত ২৯ আগস্ট একটি হ্যাঁচকা টানে শুধু একটি ব্যাগ খোয়া যায়নি, শেষ হয়ে গেছে একটি জলজ্যান্ত প্রাণ।
রনজিনা পারভীনের স্বামী আবদুল মতিনের কণ্ঠে শুধুই আক্ষেপ, “রাজধানীর মতো শহরে, তাও আবার সংসদ ভবনের সামনেই যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে মানুষ চলবে কীভাবে? তাদের নিরাপত্তা কোথায়?”
২০২৬ সালের প্রথম আট মাসেই (জানুয়ারি থেকে আগস্ট) রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ঘটনায় অন্তত সাতজনের মৃত্যু হয়েছে।
ফেব্রুয়ারি: সায়েদাবাদে ছুরিকাঘাতে মোশারফ হোসেন এবং মিরপুরের বাউনিয়াবাঁধে ২৫ বছর বয়সী রায়হান নিহত হন।
মার্চ: উত্তরায় ব্যাগ টানার ঘটনায় ২১ বছর বয়সী মুক্তা আক্তার এবং শেওড়াপাড়ায় ছুরিকাঘাতে দন্তচিকিৎসক ড. বুলবুল প্রাণ হারান।
জুন: ব্যাগ টানার ঘটনায় রাস্তায় পড়ে মারা যান সোহেলি ইসলাম।
আগস্ট: রনজিনা পারভীন ছাড়াও কদমতলীতে ছিনতাইয়ের সময় এক অজ্ঞাত ব্যক্তি নিহত হন।
আরও পড়ুন: খেলাপি ঋণে বিশ্ব রেকর্ড: ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে শীর্ষে বাংলাদেশ
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ছিনতাইয়ের ঘটনায় ১৭২টি মামলা হয়েছে এবং গ্রেপ্তার হয়েছেন ১ হাজার ৮৩৭ জন। বিপুল এই গ্রেপ্তারের পরও ছিনতাই না কমার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপকমিশনার মো. আকতার হোসেন বলেন, “আমাদের কাজ অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করা। কিন্তু দেখা যায়, তারা আদালত থেকে জামিন নিয়ে বেরিয়ে আবারও একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক জানান, ছিনতাইকারীদের হাতে এখন হরহামেশাই ধারালো ও আগ্নেয়াস্ত্র দেখা যাচ্ছে। অথচ অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ দণ্ডবিধির কড়া ধারার পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত হালকা ধারায় মামলা করে, যা আসামিদের সহজে জামিন পেতে সাহায্য করে।
এছাড়া ডিবির তথ্যমতে, ‘টানা পার্টি’ বা ছিনতাইকারী চক্রের প্রায় ৯৮ শতাংশ সদস্যই মাদকাসক্ত। এই চক্রগুলোর পেছনে রয়েছে প্রভাবশালী 'গডফাদারদের মদদ'। তারাই গ্রেপ্তারকৃতদের জামিনের ব্যবস্থা করে এবং চোরাই মালামাল বিক্রির নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করে।
পুলিশের হিসাবে ছয় মাসে ১৭২টি মামলার কথা বলা হলেও বাস্তবে ছিনতাইয়ের সংখ্যা বহুগুণ বেশি। আইনি ঝামেলা ও হয়রানির ভয়ে ভুক্তভোগীদের বড় অংশই থানায় যান না। জুলাই ও আগস্ট মাসেই ঢাকার তিনটি প্রধান হাসপাতালে দুই শতাধিক ভুক্তভোগী ছিনতাইকারীর আঘাতে আহত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন।
ফার্মগেট, মহাখালী, সায়েন্সল্যাব, সায়েদাবাদ, গুলিস্তান, মিরপুর কিংবা উত্তরা— চিহ্নিত হটস্পটগুলোতে ছিনতাইকারীদের এই রাজত্ব বন্ধে আইনি জটিলতা ও সিন্ডিকেট ভাঙার জোরালো দাবি তুলছেন নগরবাসী।
আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রয়োজনীয় ঘরগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে *
অফিস (বাংলাদেশ) : ক-২৭১, ১০ম তলা, রংধনু কর্পোরেট অফিস, কুড়িল বিশ্বরোড, ঢাকা-১২২৯
ই-মেইল : info@newstime.net
Creating Document, Do not close this window...